কলেজের গেটের সামনে অভিভাবকদের ভিড়। সবাই দাঁড়িয়ে আছেন পরীক্ষা শেষ হওয়ার অপেক্ষায়। এর মাঝেই চোখে পড়ল এক ভদ্রলোককে। বয়স পঞ্চাশের আশেপাশে। পরনে জিন্স আর একটি সাধারণ টি-শার্ট। এক হাতে একটি সবুজ, টাটকা ডাব এইমাত্র কেনা, গায়ে এখনো বিক্রেতার সাদা পলিথিন জড়ানো। অন্য হাতে একটি প্লাস্টিকের হাতপাখা।
ডাবটা তিনি এমন যত্ন করে কখনো বুকের কাছে কখনো হাতে ধরে আছেন, যেন ছোটবেলার বাবারা আদরের সন্তানকে আগলে রাখেন।
চারপাশে শত শত অভিভাবক। কেউ গল্প করছেন, কেউ মোবাইলে ব্যস্ত, কেউ রোদের মধ্যে ছাতা মাথায় দিয়ে পায়চারি করছেন। কিন্তু এই মানুষটা চুপচাপ। কাউকে কিছু বলছেন না। শুধু একদৃষ্টে কলেজের গেটের দিকে তাকিয়ে আছেন।
ভেতরে তার মেয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। আজ বাংলা পরীক্ষা। হয়তো বাবার কাছে এটাই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। তাই মনে হয়েছে এতক্ষণ পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়া মেয়ের হাতে একটা ঠান্ডা ডাব তুলে না দিলে কী চলে?
বেলা বাড়ছে। রোদও তীব্র হচ্ছে। লোকটা একবার ডাবটা এক হাত থেকে আরেক হাতে নিলেন। তারপর আবার বুকের কাছে আগের মতোই ধরে রাখলেন।
হঠাৎ গেট খুলে গেল। দল বেঁধে মেয়েরা বের হতে শুরু করল। কেউ হাসছে, কেউ মুখ ভার করে হাঁটছে৷
ভদ্রলোক হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। গলা একটু লম্বা করলেন। চোখদুটো ব্যাকুল হয়ে ভিড়ের মধ্যে কাউকে খুঁজতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত পর একটি মেয়ে দৌড়ে এলো। বয়স সতেরো-আঠারো হবে। বাবাকে দেখেই ক্লান্ত মুখে ফুটে উঠল একটুখানি হাসি।
বাবা কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না।
পরীক্ষা কেমন হয়েছে?
কঠিন ছিল?
কয়টা প্রশ্ন লিখেছ?
একটাও না।
তিনি শুধু হাতে ধরা ডাবটা মেয়ের দিকে এগিয়ে দিলেন। মেয়েটি ডাবটা নিয়ে চুমুক দিল।
আর বাবা... শুধু তাকিয়ে রইলেন।
এই দৃশ্যের কোনো ভাষা হয় না।
না বাংলায়, না ইংরেজিতে।
পৃথিবীর কোনো অভিধানেই এখনো এমন কোনো শব্দ তৈরি হয়নি, যা এই এক মুহূর্তের অনুভূতিটাকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারে।
আমরা বড় হতে হতে বাবার এই নীরব ভাষাটা পড়তে ভুলে যাই। কিন্তু বাবারা কখনো ভুলে যান না কীভাবে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয়, শব্দ ছাড়াই।

Comments
Post a Comment